৩১ মার্চ ঢাকার হোটেল শেরাটনে বিসিএস ডিজিটাল এক্সপো ২০১০এর উদ্বোধন করেন প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত, বানীজ্য মন্ত্রী লে. কর্ণেল (অব.) ফারম্নক খান, বিজ্ঞান ও আইসিটি প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান এবং এশিয়ান ওশেনিয়ান কম্পিউটিং ইন্ডাষ্ট্রি অগ্রানাইজেশন-এর সভাপতি মিঃ লই কিন লিয়ং। এছাড়াও আরো বক্তব্য রাখেন সাউথইস্ট ব্যাংক লিঃ-এর চেয়ারম্যান আলমগীর কবির এফ.সি.এ, এসোসিও-এর উপ-সভাপতি আব্দুলস্নাহ এইচ কাফী, এ্যাজিয়াতা বাংলাদেশ লিঃ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক/সিইও মিঃ মিখাইল কোহেনার। বিসিএস সভাপতি মোসত্দাফা জব্বার এর সভাপতিত্বে উক্ত অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন মেলার আহবায়ক জনাব মোঃ শাহিদ-উল মুনীর।
‘বিসিএস ডিজিটাল এক্সপো-২০১০’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন- এ ধরনের মেলার আয়োজন দেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শিল্পের উন্নয়ন ও সমপ্রসারণে গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তিনি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম স্বাধীনতার সুবর্ণজয়নত্দী বছর ২০২১ সালের মধ্যে আমরা একটি ক্ষুধা, দারিদ্র ও নিরৰরতামুক্ত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ে তুলব। যে বাংলাদেশ হবে আলোকিত, সমৃদ্ধ এবং আধুনিক বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, আমরা চাই, এই কর্মসূচীর মাধ্যমে যাতে দেশের মানুষ ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ডিজিটাল বাংলাদেশের আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পেঁৗছে দেওয়া এবং দূর্নীতির হাত থেকে দেশ ও সমাজ রৰা করা। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার। ১৯৭৫ সালে জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার পর জাতির অগ্রযাত্রাকে সত্দব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যনত্দ আওয়ামী লীগের ৫ বছর ছাড়া, ৩০ বছর সামরিক-বেসামরিক লেবাসে যারা দেশ শাসন করেছে তাদের একমাত্র কাজ ছিল নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন, জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ। অথচ এ সময়ে দেশ অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারত। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করে আমরা কৃষি, শিল্প, শিৰা, অর্থনীতি প্রতিটি ৰেত্রে অভাবিত সাফল্য অর্জন করি। দেশ খাদ্যে স্বয়ং-সম্পূর্ণ হয়। জিডিপি’র হার ৬ শতাংশের উপরে উঠে। মূল্যস্ফীতির হার আমরা ১.৫৯ শতাংশে নামিয়ে আনি। স্বাৰরতার হার ৬৫.৪ শতাংশে উন্নীত হয়। বিদু্যতের উৎপাদন ১৬০০ মেগাওয়াট থেকে ৪৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করি।
তিনি বলেন, সাত বছর পর ২০০৯ সালে আমরা যখন আবার দায়িত্ব নিলাম, দেখলাম, আমরা দেশকে যেখানে রেখে গিয়েছিলাম সেখানেই স্থবির হয়ে আছে। কোন কোন ৰেত্রে অনেক পিছিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আজ বিদু্যতের সমস্যা, পনির সমস্যা, গ্যাসের সমস্যা। বিগত সাত বছরে এক মেগাওয়াট বিদু্যৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়নি। অথচ চাহিদা বেড়েছে অনেক। আমরা যে কয়টি গ্যাস ৰেত্র আবিষ্কার করে রেখে গিয়েছিলাম, সেখানেই থেমে আছে। বিদু্যতের জন্য প্রয়োজন গ্যাস। নতুন গ্যাস ৰেত্র আবিষ্কার না করার ফলে বিদ্যমান বিদু্যৎ কেন্দ্রগুলোই চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই বিদু্যৎ ও জ্বালানিখাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি। কিন্তু আপনারা জানেন, রাতারাতি বিদু্যৎ উৎপাদন সম্ভব না। তবু আমরা গত এক বছরে প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট বিদুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ করেছি। চলতি বছর আরও ৮০০ মেগাওয়াট বিদু্যৎ যোগ হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশে এখন সেচ মওসুম চলছে। আমাদের খাদ্য-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সেচ পাম্পগুলোতে নিরবিচ্ছন্ন বিদু্যৎ সরবরাহ দিতে হবে। ইতোমধ্যেই কয়েকটি সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখে বিদু্যৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছি। আশা করছি আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বিদু্যৎ খরচ করা যাবে না। বিদু্যৎ পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হবে। তবে দেশবাসীকে বিদু্যৎ ব্যবহারেও সাশ্রয়ী হতে হবে। অযথা বাড়তি বিদু্যৎ খরচ করা যাবে না। বিদু্যৎ এমন একটা পন্য যা টাকা দিলেও পাওয়া যায় না।
বিশ্ব অর্থনৈতিকমন্দা ও বিশ্বখাদ্যঘাটতি সত্ত্বেও আমরা দয়িত্ব নেওয়ার পর দ্রব্য-মূল্য কমিয়ে আনতে সৰম হয়েছি। বিগত সরকারের সময়ে যে চালের দাম ছিল ৪৫ টাকা আমরা সেই চালের দাম ১৮/২০ টাকায় কমিয়ে আনতে পেরেছিলাম বর্তমানে যা ২৩ টাকা।
আমরা ইতোমধ্যেই কৃষকের জন্য কৃষি কার্ড চালু করেছি। ৯০ টাকার সার কৃষক এখন ২২ টাকায় পাচ্ছে। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য ন্যাশনাল সার্ভিস প্রকল্প চালু করেছি।
তিনি বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পদৰেপ হিসেবে আমরা ইতোমধ্যেই ICT ACT 2009 প্রণয়ন করেছি এবং ICT ACT 2009 অনুমোদন দিয়েছি। এ নীতিমালায় প্রতিটি মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের কর্মপরিধি সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার সঙ্গে টেলিযোগাযোগের একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যনত্দ সরকারে থাকতে আমরা মোবাইল ফোনের মনোপলি ব্যবসা ভেঙে দিয়ে তা সাধারণ মানুষের ক্রয় ৰমতার মধ্যে নিয়ে এসেছিলাম। কম্পিউটারের উপর সবধরনের শুল্ক মওকুফ করেছিলাম। যার সুফল আজ জনগণ পাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রত্যনত্দ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে মোবাইল প্রযুক্তি। মানুষ এখন দেশ-বিদেশে অনেক কম খরচে কথা বলতে পারছে। প্রযুক্তি ভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রম্নত হওয়ার ফলে কথা বলা ছাড়াও ইন্টারনেটে তথ্য আদান-প্রদান, বিনোদনসহ নানা ধরনের সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা গ্রামাঞ্চলে উন্নত তথ্য-যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে ফাইবার অপটিক ক্যাবল সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছি। প্রাথমিকভাবে ১০০টি ইউনিয়ন পরিষদকে ফাইবার অপটিক কেবল সংযোগ স্থাপনের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে আরও এক হাজার এবং পর্যায়ক্রমে সব উইনিয়ন পরিষদকে ফাইবার অপটিক কেবল সংযোগের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উপযুক্ত মানবসম্পদ তৈরীর জন্য মাধ্যমিক ও তদুধর্্ব পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয় সিলেবাসভুক্ত করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি শিৰা প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সংযোগসহ কম্পিউটার ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হবে। ১২৮ টি উপজেলায় ইতোমধ্যে কম্পিউটার ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং অন্য সকল উপজেলাতেও কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হবে। দেশের ৫টি উপজেলায় “Community E-Center” স্থাপন করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে দেশের সকল উপজেলাতেই “ECommunity E-Center” স্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রানত্দে ৮ হাজার ৫০০টি পোস্ট অফিসে “e-Center for rural community” স্থাপন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তরসমূহের প্রয়োজনীয় সকল তথ্যসমৃদ্ধ ওয়েবসাইটসমূহ তৈরি করা হয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলা ও ৭টি বিভাগের জন্য গুরম্নত্বপূর্ণ তথ্যসমৃদ্ধ ওয়েব পোর্টাল তৈরি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাথে মন্ত্রিপরিষদ ও ৬৪টি জেলা প্রশাসক এবং ৭টি বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর Video Conference সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, তিন পার্বত্য জেলা -বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িসহ সারাদেশকে ইতোমধ্যে টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে।
গাজীপুর Hi-Tech Park এর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠানো তৈরী করা হচ্ছে। সমগ্র দেশকে e-Governance এর আওতায় আনার লৰ্যে দেশজুড়ে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। Satellite স্থাপনের জন্য সরকার প্রয়োজনীয় পদৰেপ নিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি আশা করব এই স্বপ্নের বাংলাদেশ তথা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গঠনের জন্য সবাই সম্মিলিতভাবে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসবেন। এৰেত্রে সরকারের পৰ থেকে সকলের মতামত, পরিকল্পনা ও কর্মপদ্ধতির যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার ৰেত্রে আইসিটি সংশিস্নষ্ট প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, সংগঠন ও ব্যাক্তিবর্গের গুরম্নত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
তিনি বলেন, এশিয়া ও প্রশানত্দ মহাসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশের, বিশেষ করে Asian- oceanian Computing Industry Oganization (ASOCIO)-এর প্রেসিডেন্টসহ অন্যান্য যেসব বন্ধুরা এ সম্মেলনে যোগদান করছেন আমি বাংলাদেশের পৰ থেকে তাঁদেরকে স্বাগত জানাচ্ছি এবং আমাদের দেশে আইসিটিতে বিনিয়োগসহ প্রযুক্তিগত সব ধরণের সহায়তা প্রদানের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
শেখ হাসিনা বলেন, আগামী ২০২০ সাল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠা বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর সহমানের জন্মশতবার্ষিকী। ২০২১ সাল আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়নত্দী। ইনশালস্নাহ্ ২০২১ সালে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলব। সেই বাংলাদেশ হবে সুখী, সমৃদ্ধ, আধুনিক বাংলাদেশ যেখানে থাকবে না ক্ষুধা, দারিদ্র আর অশিৰার অন্ধকার।

  • Share/Bookmark

Leave a Reply

Copyright © 2010 Computer Barta All rights reserved | Powerd by Computer Barta Web Team | Designed & Develop by Little Bytes Team