কারেন্ট নিউজ
   
 
এডভার্টাইজমেন্ট
 
 
প্রযুক্তি আকাশ থেকে খসে পরলো আরো একটি তারা স্টিভ জবসের মৃত্যুতে শোকে মাতম প্রযুক্তি বিশ্ব
পৃথিবীতে বিরল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন স্টিভ জবস্ যার অভাব যুগ যুগ ধরে অনুভব করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। যার মধ্যে ছিলো আবেগ আর স্বভাবে একটু ধ্যাপাটে ধরনের। যার বুদ্ধিমত্তা, উৎসাহ ও কর্মোদ্যম অসংখ্য উদ্ভাবনের উৎস যা আমাদের সমৃদ্ধ করেছে আর সবার জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সহায়তা করেছে। আর এই বিরল প্রতিভার মানুষটি হচ্ছেন বিশ্ববিখ্যাত কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস। যিনি দীর্ঘদিন ক্যান্সারে ভুগে গত বুধবার যুক্তরাষ্টের ক্যালিফোর্নিয়ায় মৃত্যুবরন করেছেন।
 
 
প্রযুক্তিতে অসমান্য অবদান রেখে যাওয়া এই ব্যক্তিত্বকে নিয়েই আমাদের আজকের প্রতিবেদন। সিরীয় বংশোদূত আবদুল ফাত্তাহ জাদ্দালি ও মা জোয়ান সিবিলের গর্ভে ১৯৫৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী সানফ্রান্সিসকোয় জন্ম জবসের। কিন্তু জবসের জন্মটা সুখকর ছিলো না। অবিবাহিত মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়াতে তাকে জন্মের পরপরই দত্তক দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তার তরুনী মা। জবসকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর শর্তে সিলিকন ভ্যালির এক আইনজীবী দম্পতির কাছে দত্তক দেন তিনি। এই দরিদ্র আইনজীবী দম্পতির কাছেই বড় হতে থাকেন জবস। তিনি যেখানে বড় হন সেখানে ছিলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কারখানা। পরিবেশগত কারনেই প্রযুক্তিও প্রকৌশলের নানা কারিকুরি আকৃষ্ঠ করে তাকে। জবসের জন্মের ১৭ বছরের পরের কথা। তার দত্তক নেয়া বাবা-মা তাকে সত্যিই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন কিন্তু জবস এমন এক বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিয়েছেন যার ব্যয় বহন করতে তার পরিবারের জমানো সব টাকাই প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছিল। তাকে ভর্তি করানো হয়েছিলো যুক্তরাষ্টের রিড কলেজে। যার ব্যয় ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমান। বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন যারার পর জবস বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার ছয় মাসের মাথায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়েন। যদিও তখন তার কাছে মনে হয়েছিলো এটা একটা ভয়াবহ সিদ্ধান্ত কিন্তু পরবতর্ী জীবনে তিনি মনে করতেন এটাই ছিলো তার জীবনের সব থেকে বড় সঠিক সিদ্ধান্ত। তিনি যেহেতু ছিলেন একজন ড্রপ-আউট তাই কলেজ হোস্টেলে নিজের কোনো রুম ছিলো না। বন্ধুদের রুমের মেঝেতে ঘুমোতেন। কোকের বেতাল ফেরত দিয়ে পাওয়া পাঁচ সেন্ট দিয়ে খাবার কিনে খাবার অবিজ্ঞতাও রয়েছে জবসের। এক বেলা ভালো খাবারের জন্য সপ্তাহের প্রতি রবিবার সাত মাইল হেটে হরিকৃষ্ণের মন্দিরে যেতেন তিনি। কিন্তু তখন তার কলেজে ক্যালিগ্রাফি শেখানো হতো। যেহেতু তিনি ছিলেন ড্রপ-আউট তাই তিনি চাইলেই যেকোনো কোর্স নিতে পারতেন। জবস বেছে নেন ক্যালিগ্রাফির ক্লাস যাতে তিনি টাইপোগ্রাফিকে কিভাবে আরও অসাধারন করে তোলা যায় তা শিখতে পারেন। কিন্তুু তিনি এর পাঠ না চুকিয়েই ভারতে চলে যান আধ্যাতিক সাধনার জন্য। সেখান থেকে ফিরে আসেন, ফিরে এসে এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে বাড়ির গ্যারেজে বসে ম্যাক কম্পিউটারের ডিজাইন করেন জবস। আর গড়ে তোলেন তার প্রিয় ফলের নামানুসারে অ্যাপল, তার ১০ বছরের মাথায় সেই উদ্যোগই পরিনত হয় দুই বিলিয়ন ডলারের অ্যাপল কোম্পানি আর চার হাজার কর্মীর জীবিকার ক্ষেত্র।

তার মাত্র ৩০ বছর বয়সে জবস বাজারে ছাড়েন ম্যাকিন্টোস যার জন্য অ্যাপল তাকে চাকরিচু্যত করে। যিনি উদ্যোক্তা তিনিই যদি তার নিজের হাতের গড়া প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচু্যত হন তাহলে হতাশা আসাটাই স্বাভাবিক। জবসেরও তাই হয়েছিলো কিন্তু ষ্টিভ যখন হাতাশার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন তখন তার মনে হলো, উদ্যোক্তা হবার সম্ভাবনা যে প্রজন্ম তার হাতে তুলো দিয়েছিলো সামনে চলার বাটন, তাদের হতাশ করে ব্যাটনটি মাটিতে ফেলে তিনি ভুল করেছেন। তখন তিনি মনে করেন অ্যাপল থেকে বিতাড়িত হয়েই তার জীবনের বাঁক পরিবর্তনের সুযোগ এসেছে। এর পরের বছর জবস পিক্সার ও নেক্সট নামে নতুন আরো দুটি কোম্পানি গড়ে তোলেন। আর এ সময়েই প্রেমে পড়ে লরেন্স নামের এক অসাধারন নারীর। নেক্সট নামের প্রতিষ্ঠানটির লর্ক্ষ ছিলো নুতন প্রজন্মের অপারেটিং সিস্টেম বানানো। আর এতে জবসের উদ্দেশ্য ছিলো কম্পিউটারের নানা রকম অনুষঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করা। যাতে মানুষে মানুষে সংযুক্তি আর যোগাযোগ হয় সর্বজনীন আর সহজসাধ্য। অপরদিকে জবসের হাত ধরে পিক্সার থেকে সূচিত হয় জব স্টোরি নামে একটি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র। এই টপ স্টোরির গল্প শুধু গল্পই থাকে না, হয়ে ওঠে চলচিত্রের বাঁকবদলের ক্ষন। অপরদিকে নেক্সটের ফলাফল নিয়ে ১৯৯৭ সাথে প্রবলভাবে অ্যাপলে ফিরে আসেন জবস। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি জবসকে। জবসের হাত ধরে অ্যাপল থেকে আমরা পাই আইপ্যাক, আইপড, আইফোন কিংবা আইপ্যাড তবে এর সবটাতেই জবসের বিশেষ কয়েকিট বৈশিষ্ট্য ছিলো। এর মধ্যে প্রথমটি ছিলো অতৃপ্তি। তিনি সবসময়ই একটি সম্পূর্ণ পন্য তৈরী করতে চাইতেন। গভীরে ঢোকার অভ্যাস জবসের শুরু থেকেই ছিলো। আর অ্যাপলে এসে এর পূর্ণতা পায়। আরও একটি বৈশিষ্ট্য ছিলো জবসের, আর তা হলো ব্যবহারকারীর হাত আর চোখ দিয়ে পণ্যকে বিচার করা, এই কারনেই তিনি কোনো নতুন পণ্য তৈরীর পর আগে তিনি নিজে ব্যবহার করে দেখতেন। তিনি সবসময়ই ভাবতেন কিভাবে পণ্যকে আরও সহজভাবে ব্যবহারকারীর কাছে উপস্থাপন করা যায়। এর প্রমান মেলে, জবস চাইতেন না আইফোনে কোনো সুইচ বা বাটন থাকুক কিন্তু একটি সুইচ বা বাটন থাকা যে অপরিহার্য তা প্রকৌশলীরা তাকে বুঝিয়েছেন। গ্যারেজ থেকে উঠে আসা অ্যাপল ইনকরপোরেটড বাজার মূলধন এখন ইন্টেল আর মাইক্রোসফট্রে সম্মিলিত বাজার মূলধন থেকেই বেশি। অ্যাপলের বিশ্বব্যাপী রয়েছে কয়েক লাখ কর্মী। অ্যাপল তার মিউজিক স্টোরের মাধ্যমে বিশ্বের হাজার হাজার তরুন-তরুনী এখন নিজেদের দিন বদলের রাস্তা খুঁজে নিচ্ছেন। যদি স্টিভ জবসের জন্ম না হতো তাহলে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের বাসিন্দাদের অনেকেরই কিন্তু কম্পিউটার ব্যবহার করা সম্ভব হতো না। কিন্তুু যে জবস্ আমাদের জন্য কম্পিউটার সহজসাধ্য করেছেন তার শেষ গল্পটি ছিলো মৃতু্য নিয়ে। ২০০৪ সালে জবস্ কান্সারে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানান চিকিৎসকেরা। প্যানক্রিয়াস কান্সার সম্পর্কে কোনো ধারনা ছিলো না তার। চিকিৎসকরা জানান সবোচ্র্চ ছয় মাস তিনি বেঁচে থাকবেন। চিকিৎসকরা সেদিনই দ্বিতীয়বারের মতো জবসের বায়োপসি এবং এন্ডোসকপি করে দেখতে পান তার টিউমারে এমন কিছু বিরল সেল আছে যা সার্জারির মাধ্যমে অপসারন সম্ভব এবং সেটাই করা হলো।

এরি ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালেই তার দেহে কৃত্রিম পাকস্থলী প্রতিস্থাপন করা হয়। অসুস্থতার কারনে জবস্ চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারী থেকে অনিদিষ্টকালের জন্য ছুটিতে ছিলেন। পরে অবশ্য আবারও স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান অ্যাপলে যোগ দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত গত আগষ্টে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী পদ থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। তার স্থলাভিষিক্ত হন তারই দীর্ঘদিনের সহকর্মী টিম কুক। আর জবসকে করা হয় অ্যাপলের চেয়ারম্যান। অবশ্য প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ হিসেবে জবস্ তার অসুস্থতাকেই উল্লেখ করেন। ২০০৫ সালে জবস্ আমন্ত্রিত হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে। সেখানে তিনি বলেন, আমর বয়স যখন ১৭ ছিলো তখন আমি একটি উদ্বৃতি পড়েছিলাম-

"তুমি যদি প্রতিটি দিনকেই তোমার জীবনের শেষ দিন ভাবো, তাহলে সত্যি সত্যিই একদিন সফল হবে"।

আর এ কথাটাই আমার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিলো এবং সেই থেকে গত ৩৩ বছর আমি প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করি, আজ যদি আমার জীবনের শেষ দিন হতো, তাহলে আমি কি যা যা করতে যাচ্ছি, তাই করতাম, নাকি অন্য কিছু করতাম? পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে এ জিনিসটা মাথায় রাখার ব্যাপারটাই জীবনে আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহয্য করেছে। কারণ প্রায় সবকিছুই যেমন সব অতি প্রত্যাশা, গর্ব, সব লাজলজ্জা আর ব্যর্থতার গ্লানি, মৃতু্যর মুখে হঠাৎ করেই সব মিলিয়ে যায়। টিকে থাকে শুধু তাই যা আমি গুরুত্বপূর্ণ। কেউই মরতে চায় না এমনকি যে স্বর্গে যেতে চায় সেও মরতে চায় না। কিন্তুু তারপরও যেতে হবে। তেমনি জবস্ও আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন গত ৬ অক্টোবর। যদিও সবাই জানতো জবস বেশিদিন এই পৃথিবীতে থাকবেন না তারপরও বিশ্বের প্রযুক্তি প্রেমীরা তাকে বিদায়ের কথা জানানোর সুযোগ পেলেন না। তার মৃতু্যতে বিল গেটসসহ শীর্ষ দেশের রাষ্ট্র নায়ক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ সব শ্রেনীর মানুষ শোকে বিহবল। মাইক্রোসফ্টের চেয়ারম্যান বিল গেটস বলেন, "জবসের মৃতু্যর খরব শুনে আমি মর্মাহত। সেলিন্ডা ও আমি জবসের পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি"। ইয়াহুর প্রতিষ্ঠাতা জেরি ইয়াং বলেন- বড় হওয়ার জন্য স্টিভ জবস ছিলেন আমার হিরো। তিনি আমাকে শুধু ব্যক্তিগত ভাবে উৎসাহ ও উপদেশই দেননি, দেখিয়েছেন নতুনত্ব আমাদের জীবনকে বদলে দিতে পারে। আমি বিশ্বের মানুষের মতোই তার অভাব অনুভব করব। ফেইসবুকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জুকারবার্গ বলেন, "স্টিভ তোমাকে ধন্যবাদ বন্ধু ও পরামর্শদাতা হবার জন্য। আমি তোমার অভাব অনুভব করব"। এছাড়াও জবসের মৃতু্যতে আনুষ্ঠানিক লোকবার্তা ছাড়াও ফেইসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলোতো শোক জানিয়েছে কয়েক লাখ মানুষ।

সংক্ষিপ্ত জীবনীঃ
জন্মঃ ২৪ ফেব্রুয়ারী, ১৯৫৫। সানফ্রান্সিসকো, যুক্তরাষ্ট।
বয়সঃ ৫৬ বছর।
শিক্ষাজীবনঃ ১৯৭২ সালে ভর্তি হন পোর্টল্যান্ডের রিড কলেজে। তবে ছয় মাস পড়েই কলেজ ছাড়েন পড়া শেষ না করেই।
পরিবার- স্ত্রী লরেন পাওয়েল।
সন্তান- তিন সন্তান, রিড পল, এরিন মিয়েনা ও ইভ।
ক্যারিয়ারঃ ১৯৭৬ সালে অ্যাপল প্রতিষ্ঠানের আগে ভিডিও অ্যাটারিতে কাজ করতেন। ১৯৮৪ সালে ম্যাক কম্পিউটার বাজারে ছাড়েন আর অ্যাপল প্রতিষ্ঠার পর তার তত্ত্বাবধানে বাজারে আনে আইপড, আইফোন, অ্যাইপ্যাড সহ বিভিন্ন জনপ্রিয় প্রযুক্তিপন্য।
মৃত্যুঃঅক্টোবর ২০১১ইং

"প্রযুক্তি নায়ক স্টিভ জবসকে সম্মান জানাচ্ছে আমাদের কম্পিউটার বার্তা পরিবার। পরপারে সুখে থাকো স্টিভ................."

মোঃ নাজমুল হোসেন ও রেমি রাইয়ান লুনা
 


এডভার্টাইজমেন্ট